বিশেষ প্রতিনিধি :
বিএনপির গুরুত্ব পাচ্ছে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা
রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ইতঃপূর্বে ঘোষিত ৩১ দফাসহ জনকল্যাণমুখী ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রস্তুত করছে বিএনপি। নতুন ভাবনার মধ্যে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় রেখে অগ্রসর হচ্ছে দলটি। দেশ গড়ার পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্যের মূল বিষয়গুলোও ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে। আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’ নির্বাচনি ইশতেহারে যোগ হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ তৈরির পরিকল্পনা ও বিএনপি নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসাবে রাখছে দলটি। প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ ও নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শুরুর দু-একদিন আগে-পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করবে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম ও ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্য জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে ২৮ দিন। সময়ের এই হিসাব বিবেচনায় রেখেই দলটির জনকল্যাণমুখী ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখন চলছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে দলের স্থায়ী কমিটি নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত করবে, যা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীর উদ্দেশে তুলে ধরা হবে। এ প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় শেষদিকে। ২০ জানুয়ারির মধ্যে এটা চূড়ান্ত হবে। আশা করি, শিগগিরই আমরা ইশতেহার ঘোষণা করতে পারব।
জানা যায়, এবারের ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা, ‘ভিশন ২০৩০’, জুলাই জাতীয় সনদ, গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ৮টি বিশেষ খাতের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ৩১ দফার মূল বিষয়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারসহ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টিও স্থান পাবে ইশতেহারে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি। এর মধ্যে একেবারে নতুন ভোটার আছে কমবেশি এক কোটি। এই বিশালসংখ্যক ভোটার এবারই প্রথম ভোট দেবেন। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি।
জামায়াতের থাকছে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার বার্তা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় ইশতেহার চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জুলাই চেতনাকে ধারণ করে তৈরি হবে ইশতেহার। এতে দেশের কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রকাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। থাকছে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে তোলার কঠোর বার্তা। সততা, দেশপ্রেম, দুর্নীতিকে ‘না’ বলতে হবে। ‘দুর্নীতি করব না-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না।’ এমন স্লোগান থাকছে জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারে। ২০ জানুয়ারির পর যে কোনোদিন এই ইশতেহার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব যোবায়ের। দলীয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স জামায়াত। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা দুর্নীতি কমিয়ে আনতে পারলে দেশের বহু সমস্যাই দূর হবে বলে মনে করে দলটি। ফলে ক্ষমতায় গেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য জামায়াত কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে। প্রশাসনের সর্বস্তরে এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হবে।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিটি শিশুর অধিকার। সর্বস্তরে সততার নীতি কায়েম করতে শিশু বয়স থেকেই নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষাব্যবস্থার শুরু থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে আনা, অপরিকল্পিত শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসা, উচ্চতর গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা থাকছে ইশতেহারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জামায়াত গড়ে তুলতে চায় কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
এনসিপির সরকার পরিচালনার রূপরেখা
‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারসহ ২৪ দফা ঘোষণা করেছে। এবার এই ২৪ দফার আলোকে নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলটি ‘ইশতেহার তৈরি সেল’ গঠন করতে যাচ্ছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম নির্বাচনি ইশতেহারে তারা নতুনত্ব রাখার চেষ্টা করছেন। ২৪ দফার সঙ্গে আরও বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হবে। সরকারে গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে-সেটির রূপরেখাসহ নানা প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে। এছাড়া তরুণ ও ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকারে রাখা হবে। একই সঙ্গে নারীর উন্নয়নসহ ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কার গুরুত্ব পাবে।
জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাচনি মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার তৈরির কাজ আগেই শুরু হয়েছে। এখন চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে। এ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আমরা চাই একটি আদর্শ ইশতেহার তৈরি করতে। এ ইশতেহারের আলোকে দেশ পরিচালনা এবং দেশের মানুষের কল্যাণ করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের ২৪ দফা তো আছেই। এখন নির্বাচনি ইশতেহারে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হবে। সরকারে গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে, এর রূপরেখাসহ নানা প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে।