
শামীম আল আজিজ লেলিন :
জিয়াউর রহমান যখন দেশের জন্য রণাঙ্গনে তখন বেগম খালেদা জিয়ার বয়স ছাব্বিশ। যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হলে ছাব্বিশেই স্বামীহারা হতেন। যুদ্ধে বাংলাদেশ পরাজিত হলে ও স্বামীকে হারাতে হতো। স্বামী মুক্তিযুদ্ধে। নিজে দুই শিশু সন্তান নিয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকায় আত্মগোপনে। ঢাকা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী। সাত মাস ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অনিশ্চিত-দুর্বিসহ কারারূদ্ধ জীবন। বেগম জিয়ার সংগ্রামের শুরুটা মূলত ছাব্বিশেই।
ছত্রিশ বছর বয়সে বেগম জিয়া স্বামী হারালেন। স্বামীর সততা-দর্শন-দেশপ্রেমকে উপজীব্য করে দুই শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে বাধ্য হয়ে রাজনীতি নামক কঠিন সংগ্রামের পথকে বেছে নিলেন। ১৯৮২ তে দলের সদস্য, ১৯৮৩ তে ভাইস-চেয়ারম্যান ও ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন অসীম সাহসিকতার সাথে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাত বার আটক ও হয়েছেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বৈধতাকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন তিনি যা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে। তার আপসহীনতার শুরু এখান থেকেই
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সফল হওয়ার পর সব পূর্বাভাস কে ভুল প্রমাণ করে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকারপ্রধান হলেন। নিজের পছন্দের রাষ্ট্রপতি শাসন দেশের প্রয়োজনে নিজের হাতেই বদলালেন। সংবিধানের ১২তম সংশোধনী আনলেন। রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটলো তারই হাত ধরে। জিয়াউর রহমানের লেগেসিকে ধারণ করে ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাজনীতি করার সুযোগ অবারিত ও সম্প্রসারিত করেছিলেন।
গ্রামীণ মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে তিনি উপবৃত্তি চালু করেন। এ উপবৃত্তি নিয়ে অসংখ্য নারী শিক্ষিত হয়েছেন এবং কর্মজীবী নারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বেগম জিয়ার এ মডেল বৈশ্বিকভাবে ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো। তিনি বৃত্তিপ্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিঠির সঙ্গে বই পাঠিয়ে অনুপ্রেরণা যোগাতেন যা শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল।
কোনো রাজনীতিবিদ ই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। প্রত্যেক রাজনীতিবিদের ই সীমাবদ্ধতা থাকে। সবকিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম জিয়ার একটি আইকনিক ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিজস্ব ভাবমূর্তি গঠন করে তিনি অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে কখনোই কোনো নির্বাচনে হারেননি। এমন আসন থেকেও জনগণ তাকে জিতিয়ে এনেছেন যেখানে বিরোধী সমর্থন অনেক বেশি ছিলো। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ও বেগম জিয়া ছিলেন ভীষণ প্রতিশ্রুতিশীল। নিশ্চিত জেল জেনে ও তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। নিরাপদ জীবন জেনে ও দেশ ছেড়ে বিদেশে যান নি।
ব্যক্তি জীবনে কম বয়সে স্বামী হারিয়েছেন। ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যু দেখেছেন। বড় ছেলে তারেক রহমান ও কাছে ছিলেন না। স্বজনহীন একাকী-নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন। চাইলেই বিদেশে যেয়ে এই দুর্বিসহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে পারতেন। কিন্তু দেশ ছেড়ে যান নি। বলেছিলেন- স্বজনহীন জীবনে দেশবাসী ই আমার স্বজন। এ দেশ ছাড়া আমার কোথাও কোনো ঠিকানা নেই।
তাকে মিথ্যা দুর্নীতির মামলা দেয়া হয়েছে। একাকী নিঃসঙ্গ জেলজীবন ভোগ করতে হয়েছে অন্যায়ভাবে। স্বামীর দীর্ঘ স্মৃতি বিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। শারীরিক অসুখ ভোগ করেছেন। চিকিৎসা নিতে বিদেশে যেতে দেওয়া হয়নি। শারীরিক অসুখসহ অপবাদ-চরিত্র হনন-নিপীড়ন-নৃশংসতার শিকার হয়েছেন। তবু ও ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নোয়াননি। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আধিপত্যবাদের সাথে আপোষ করেন নি।
দেশের যে প্রান্তেই গেছেন গণমানুষের বিপুল ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। এত জনপ্রিয় হওয়ার পর ও প্রতিপক্ষের নির্দয় ব্যক্তিগত আক্রমণ ও আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন তিনি। বারবার। অশালীন শব্দে-বাক্যে-ইঙ্গিতে তাকে ছোটো করার চেষ্টা করা হয়েছে বহুবার। নিদারুণ বিদ্রুপে বিদ্ধ করা হয়েছে তাকে। বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে। অসুস্থতায় ও আনুকূল্য পাননি। তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা হয়েছে প্রতিনিয়ত।
বেগম জিয়া কখনো এসবের জবাব দেন নি। অসীম ধৈর্য্য দেখিয়েছেন। প্রতিপক্ষের লেভেলে নেমে আসেন নি। ভাষায়-বাক্যে সংযত থেকেছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বক্তব্যে ও তার প্রমাণ মেলে। ঐ বক্তব্যে তিনি প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি ভুলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা ও শান্তির মাধ্যমে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।” দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে নিজে প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার পর ও অভ্যুত্থান পরবর্তী এ বক্তব্যে বেগম জিয়া সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
বেগম জিয়া আচরণে মার্জিত ছিলেন। শালীন রাজনীতির চর্চা করেছেন জীবনভর। গণমানুষের কাছাকাছি থেকে ও আভিজাত্য ধরে রেখেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম জিয়া এখানে ব্যতিক্রম। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে করতে নিজেই গণতন্ত্র ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। বেগম জিয়ার ব্যক্তিত্ব, নিজস্ব ভাবমূর্তি এবং বাংলাদেশ প্রশ্নে অনমনীয় দৃঢ়তার জন্য বেগম জিয়া অনন্তকাল বেঁচে থাকবে। “বাংলাদেশের খালেদা জিয়া” হয়ে। কোটি মানুষের হৃদয়ে।
আপনার কফিনের পাশে আজ গোটা বাংলাদেশ। যেনো বিভেদের সব রেখা মুছে গেছে আজ। যেনো সব মত-পথের মানুষ এক মোহনায়। এ দৃশ্য অনিন্দ্যসুন্দর। এ ছবির মতো বাংলাদেশ ই আমাদের আরাধ্য। আগামীর বাংলাদেশ এমনি হউক। আপনার বিদায় গৌরবের। আল্লাহ তাআলা আপনাকে জান্নাতবাসী করুন। আপনার প্রতি অতল শ্রদ্ধা।
লেখক: গ্র্যাজুয়েট টিচিং এসিস্ট্যান্ট, জর্জিয়া ষ্টেইট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র