২০২২ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ধুয়ে যাওয়া সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের গ্রামীণ সড়ক ও সেতু সচল করতে নেওয়া হয়েছিল হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রকল্প। কিন্তু খোদ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণে সেই পুনর্বাসন কাজ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) জরুরি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। আর এই দুর্নীতির সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে আঙুল উঠেছে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক (পিডি) খন্দকার আসাদুজ্জামানের দিকে।
সরেজমিনে প্রকল্পভুক্ত সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত যেসব গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট নতুন করে টেকসইভাবে নির্মাণের কথা ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগেরই কাজ অত্যন্ত নিম্নমানের। কোথাও কোথাও পিচ ঢালাইয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রাস্তা ধসে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাঙা রাস্তার ওপর নামমাত্র বালু ও ইটের খোয়া ছিটিয়ে পুরো কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। অনেক এলাকায় কাজ না করেই ভুয়া মাস্টাররোল এবং জাল নথিপত্র তৈরি করে শত কোটি টাকা লোপাট করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির প্রকৌশলীদের সিন্ডিকেট।
২০২৫ সালে এই প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পিডি খন্দকার আসাদুজ্জামান অনিয়মের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অংকের কমিশন (পার্সেন্টেজ) ছাড়া কোনো ফাইলের অনুমোদন মেলে না তার দপ্তরে। এই প্রকল্পকে পুঁজি করে মাত্র দেড় বছরে আসাদুজ্জামান ও তার পরিবার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক স্পেস এবং বেনামী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। সরকারি বেতনভুক্ত একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার এমন রাতারাতি ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার ঘটনা নিয়ে এলজিইডির ভেতরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে এমন হরিলুটের খবর পৌঁছানোর পর সংস্থাটির নিজস্ব তদন্ত বিভাগ (OAI) বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, দুর্নীতির কিছু প্রমাণ পেয়েছি, আরো কিছু প্রমাণ সাপেক্ষে অর্থায়ন বন্ধসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অবৈধ অর্থ লেনদেনের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এই প্রকল্পের নথিপত্র এবং পিডি আসাদুজ্জামানের অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক খন্দকার আসাদুজ্জামানের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেও তিনি প্রতিবেদকের সাথে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।